সাহেদের যত অপকর্ম

করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট প্রদান, অর্থ আত্মসাতসহ নানা প্রতারণার অভিযোগে রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম ওরফে মো. সাহেদকে গ্রেফতার হয়। গত ৬ জুলাই থেকে প্রকাশ্যে আসে রিজেন্ট হাসপাতালের একের পর এক অনিয়ম।

রিজেন্ট গ্রুপ ও ঢাকা রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ করিম ওরফে সাহেদের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল এলাকায়। সাহেদ ১৯৯৮ সালে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। পিলখানায় রাইফেলস স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে সে। এরপর আর লেখাপড়া করেনি সাহেদ। সাহেদের বাবার নাম সিরাজুল করিম। মা সাফিয়া করিম ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

নেতা পরিচয়ে ২০০৭ সালে রিজেন্ট হাসপাতালের অনুমোদন নেয় সাহেদ করিম। তবে তখন হাসপাতাল করেনি। চালাত ক্লিনিক। এরপর এই মহা প্রতারক আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দেওয়া শুরু করে। গত পাঁচ বছর ধরে সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চ (রাজনীতি গবেষণা কেন্দ্র) নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালাত সাহেদ। নিজেকে কথিত বুদ্ধিজীবী বা রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচয় দিত সে।

২০০৯ সালের জুলাই মাসে প্রতারণার মামলায় সাহেদ গ্রেফতার হয়েছিল। তখন কয়েক মাস জেলে খেটেছে সে। তবে প্রতারণা থামেনি, বরং মাত্রা বেড়ে যায় তার। ২০১০ সালের দিকে সাহেদ ধানমন্ডি এলাকায় বিডিএস কিক ওয়ান এবং কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটি (কেকেএস) নামে দুটি এমএলএম কোম্পানি খোলে। ২০১১ সালে শত শত গ্রাহকদের কাছ থেকে ৫শ’ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে সাহেদ করিম। এরপর প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে গা ঢাকা দেয় প্রতারক সাহেদ। ওই সময় এমএলএম কোম্পানির সব গ্রাহক তাকে মেজর ইফতেখার করিম নামে জানত। সেই প্রতারণা মামলায় গ্রেফতার হয়েও টাকার বিনিময়ে দ্রুত জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে আসে। এরপর এমএলএম প্রতারণায় আত্মসাৎ করা টাকা দিয়ে রিজেন্ট গ্রুপের নামে ব্যবসা শুরু করে। চালু করে ঢাকা রিজেন্ট হাসপাতাল।

আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় ব্যবহার করত সে। এছাড়াও নিজেকে কখনও অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, কখনও গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠ, আবার কখনও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দিয়ে বেড়াত। ‘নতুন কাগজ’ নামে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা খুলে নিজেকে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জাহির করে অর্থের বিনিময়ে টক শো’তে অংশ নিত সাহেদ। এরপর থেকে নিজেকে বড় সাংবাদিক বলে পরিচয়ও দিত অনেকের কাছে। কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তুলত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্পন্সর করে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করত। এরপর তার হাসপাতাল, অফিস, ও বাসার দেওয়ালে সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তোলা ছবি বাঁধাই করে টাঙিয়ে রাখত। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা ছবিকে পুঁজি করেই রিজেন্ট গ্রুপের মালিক সাহেদ অপকর্ম করে বেড়াত।

করোনা বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে রোগীদের কাছ থেকে কোনো ফি নেয়ার কথা না থাকলেও  রোগী প্রতি দেড় লাখ, দুই লাখ ও সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা বিল আদায় করত। পাশাপাশি ‘রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়েছে’ এই বাবদ সরকারের কাছে এক কোটি ৯৬ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ বিল জমা দিয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল।

সাহেদের বিরুদ্ধে রাজধানীর ধানমন্ডি, উত্তরাসহ বিভিন্ন থানায় ৩২টি মামলা রয়েছে। মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড থেকে ছয় কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার নথিতে নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মুহাম্মদ শহীদ বলে পরিচয় লেখা রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরেও তার প্রতারণার ছাপ ছিল। কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোন টাকাই পরিশোধ করেনি এই প্রতারক। সারাদেশে প্রতারক সাহেদের নামে অর্ধশত মামলা রয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পরই বের হয়ে আসতে থাকে হাসপাতালটি মালিক সাহেদ করিমের অপকর্মের ফিরিস্তি। মূলত প্রতারণা আর ভেলকিবাজিতে সিদ্ধহস্ত সে।

প্রতারণা করাই যার মূল কাজ, সেই ব্যক্তি কীভাবে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে চলাফেরা করত, কীভাবে কথিত বুদ্ধিজীবী সেজে টকশোতে অংশগ্রহণ করত, তার প্রমোটার কারা এসবই আলোচনার বিষয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা সবার সাথেই তার ছবি রয়েছে।

কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চুক্তি হয় গত ২১ মার্চ। অথচ এই হাসপাতালের অনুমোদনের মেয়াদ ২০১৪ সালেই শেষ হয়ে গেছে এবং নতুন করে এই অনুমোদনের মেয়াদ নবায়ন করা হয়নি। কেন নবায়ন নেই এমন হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়? সাহেদের সঙ্গে ক্ষমাসীন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের ও মন্ত্রীদের পরিচয় ও সুপারিশের কারণে তার হাসপাতালের কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের সঙ্গেও সাহেদের ভালো সম্পর্ক এবং স্বাচিপের শক্ত অবস্থান ছিল রিজেন্টের পক্ষে।

সাহেদের কুকীর্তি ধরা পরার পর আওয়ামী লীগের নেতারা তার রাজনৈতিক পদের কথা অস্বীকার করলেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য পদটাও তার এসব প্রতারণার কাজে যথেষ্ট সহায়তা করেছে।

 

You may also like...

Read previous post:
সরকারের ভারতপ্রীতি কিংবা ভারতভীতি 

ভারত-বাংলাদেশের বার্নিং ইস্যু বলতে আমরা যা বুঝি, তা হল,সীমান্তে হত্যাকাণ্ড আর অভিন্ন নদীর পানি বন্টন ইস্যু। কিন্ত বহুদিন ধরেই বৈঠকের...

Close